হজের পর হাজীদের করণীয় ও আমল (Things to do after Hajj)


Hajjহজ ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির অন্যতম। কোরআন শরিফে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: ‘আল্লাহর তরফ থেকে সেসব মানুষের জন্য হজ ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যারা তা আদায়ের সামর্থ্য রাখেন।’ (সুরা আলে ইমরান; আয়াত: ৯৭)। পবিত্র হজ আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ বিধান।

হজের পর হাজীদের করণীয় ও হজ্জ পরবর্তী আমল (Things to do after Hajj)

হজ থেকে ফিরে এসে নিকটস্থ মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নাত। হজরত কাব বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন মসজিদে (নফল) নামাজ আদায় করতেন।’ (বুখারি শরিফ) হজ থেকে ফিরে শুকরিয়াস্বরূপ গরিব-মিসকিন ও আত্মীয়স্বজনকে খাবারের দাওয়াত দেওয়া বৈধ। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় সে খাবারকে ‘নকিয়াহ’ বলা হয়।

হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) যখন মদিনায় এসেছেন, তখন একটি গরু জবাইয়ের নির্দেশ দেন। জবাইয়ের পর সাহাবিরা তা থেকে আহার করেছেন।’ (বুখারি) তবে অহংকার, লোকদেখানো ও বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে এমন দাওয়াতের ব্যবস্থা করা ইসলাম অনুমোদন করে না। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৭/১৮৫)

ইসলামের যেকোনো ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর হুকুম পালন করার জন্য হয়ে থাকে। ‘নামাজি সাহেব’ হওয়ার জন্য যেভাবে নামাজ পড়া হয় না, তেমনি ‘হাজি সাহেব’ হওয়ার জন্য হজ পালন করা অবৈধ। হ্যাঁ, মানুষ যদি এমনিতেই সম্মান করে ‘হাজি সাহেব’ বলে ডাকে, তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু নিজের নামের সঙ্গে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ ব্যবহার করা কিংবা কেউ এ বিশেষণটি বর্জন করায় মনঃক্ষুণ্ন হওয়া গর্হিত কাজ। (মুকাম্মাল মুদাল্লাল মাসায়েলে হজ ও ওমরাহ : ৩২১)

কতিপয় আমল কবূলের কারণ ও উপায়

১। স্বীয় আমলকে বড় মনে না করা ও তার ওপর গর্ব না করা

২। আমলটি কবূল হবে কিনা, এ মর্মে শঙ্কিত থাকা

৩। আমল কবূলের আশা পোষণ ও দো‘আ করা

৪। বেশি বেশি ইস্তেগফার-ক্ষমা প্রার্থনা

৫। বেশি বেশি সৎ আমল করা

৬। সৎ আমলের স্থায়ীত্ব ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা

হজের পর করণীয়

বিদায় তাওয়াফ শেষে যেন দুনিয়ায় নবাগত শিশু, ক্ষমাপ্রাপ্ত, প্রশংসনীয় চেষ্টা, গৃহীত আমল ও মাবরুর-গৃহীত হজ (যার প্রতিদান জান্নাত) সমাপ্ত করে ফিরে ধন্য হলো আদম সন্তান। প্রত্যেকেই চায় হজ আদায়ের জন্য মক্কা যাবে, আল্লাহ তায়ালা কে এর দ্বারা রাজী-খুশী করবে ও ইসলামের পাঁচটি রুকনের পঞ্চম রুকন বাস্তবায়ন করে ধন্য হবে। এমর্মে হাজী সাহেবগণ কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করেন। যাবতীয় কষ্ট অতিক্রম করে কুপ্রবৃত্তির উপর বিজয় লাভ করে তাকওয়ার লেবাস অর্জন করেন।

সুতরাং এ হজ আদায় শেষে নব জন্মের বেশে গুনাহ-খাতা মুক্ত দেশে ফিরে যাবে। তারপর কি পুনরায় পূর্বের ন্যায় পাপাচারে প্রত্যাবর্তন বিবেক সম্মত হবে? অতএব কিভাবে সে তার নব ভুমিষ্ট সাদৃশ মা’সুমতাকে সংরক্ষণ করবে? ও কিভাবে তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সঠিক আমলে অবিচল ও অটল থাকবে? তার জন্যই নিম্নের বিষয়গুলো সবিনয়ে নিবেদন:

প্রথমঃ এ বছর আল্লাহ আমাদের মধ্যে যাকে হজ আদায়ের তাওফীক প্রদান করে ধন্য করেছেন, তাঁর উচিত মাওলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রশংসা করা। কেননা তিনিই তাকে এ মহান ইবাদত সম্পাদন করার সুযোগ ও শক্তি দান করেছেন। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেনঃ তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দিবো, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” [সূরা ইবরাহীম: ৭]

দ্বিতীয়ঃ যেভাবে হজ সফরে বেশি বেশি দু’আ-যিকির, ইস্তেগফার-ক্ষমাপ্রার্থনা ও নিজের অপারগতা তুলে ধরে কাকুতি-মিনতি পেশ করেছি, পরবর্তীতেও তার ধারাবাহিতকতা বজায় রাখব।

তৃতীয়ঃ আমরা হজ সফরে নিশ্চিত ছিলাম যে, এটি কোন সাধারণ ও বিনোদনমূলক সফর ছিল না; বরং তা ছিল শিক্ষা-দীক্ষার প্রশিক্ষণ কোর্সও একটি ঈমানী সফর। যাতে আমরা চেষ্টা করেছি যাবতীয় গুনাহ-খাতা হতে মুক্তি পাওয়ার, স্বীয়কৃত অন্যায়-অত্যাচার হতে মুক্ত হওয়ার। হজ মাবরুর পেয়ে মা’সুম প্রত্যাবর্তন করার। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ কোন সমপ্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” [সূরা রা’দ: ১১]

চতুর্থঃ হজ সফরে আমরা ঈমানের মজা এবং সৎকর্মের স্বাদ অনুভব করেছি, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বও জেনেছি, হেদায়েতের পথে চলেছি। সুতরাং এ সবের পর আমরা কি তা পরবর্তী জীবনে জারী রাখব না? ও ভ্রষ্টতা থেকে বেঁচে থাকব না? আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নিশ্চয়ই যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশ্‌তা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার সুসংবাদ পেয়ে আনন্দিত হও।” [সূরা ফুসসিলাত: ৩০]

আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন: “অতএব, তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছো, দৃঢ় থাকো এবং সেই লোকেরাও যারা (কুফরী হতে) তাওবা করে তোমার সাথে রয়েছে, সীমালঙ্ঘন কর না; নিশ্চয় তিনি তোমাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করেন।” [সূরা হুদ: ১১২]

বিভিন্ন ইসলামিক বিষয় পড়তে ভিজিট করুন www.IslamBangla.Com । সাথেই থাকুন Prosno.XyZ ভিজিট করতে থাকুন ।

পঞ্চমঃ হালাল অর্থে আমরা হজের সুযোগ গ্রহণ করেছি, পোশাক, পানাহার পবিত্র ও হালাল গ্রহণ করেছি এবং হালালের যে বরকত তাও উপলব্ধি করেছি। অতএব অবশিষ্ট জীবনে তা কি ধরে রাখব না?

ষষ্ঠঃ সেই ঈমানী সফর থেকে আমরা বের হয়েছি যাতে আমরা মৃত্যু ও তার যন্ত্রণা, কবর ও তার আযাব এবং কিয়ামত ও তার ভয়াবহতা খুব করে স্মরণ করেছি বিশেষ করে কাফন সাদৃশ ইহরামের গোসল ও বস্ত্র পরিধানের সময়। এগুলো কি আমরা সর্বদা স্মরণ রাখব না? যে বিষয়গুলি আমাদেরকে হকের পথে, হেদায়াতের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবে এবং মৃত্যু পর্যন্ত সৎকর্মে অবিচল ও হারাম থেকে বেঁচে থাকার প্রতি উৎসাহ দিবে।

সপ্তমঃ হজ সফরে আমরা স্মরণ করেছি নবীদের, অনুসরণ করেছি আমাদের পিতা ইবরাহীম খলীলের। যিনি তাওহীদের পতাকাকে সমুন্নত করেন, ইখলাসের শিক্ষা দেন। অতএব আমরা হজে আল্লাহর জন্য ইখলাসকে আঁকড়ে ধরি এবং আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাত ও তরীকাকে অনুসরণ করি যেন আমাদের আমলগুলি গ্রহণযোগ্য হয়। অবশিষ্ট জীবন কি এমর্মে অতিবাহিত করা উচিত হবে না।

অষ্টমঃ হজের পূর্বে আমরা তাওবায় সচেষ্ট হই এবং অন্যের প্রতি যুলুম-অন্যায় ও অবিচার হয়ে থাকলে তা হতে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছি। মূলতঃ এ নীতি অবলম্বন তো সব সময়ের জন্যই।

নবমঃ হজের পূর্বে আমরা তাকওয়া-আল্লাহভীতি যথাযথ অবলম্বন করেছি। আমাদের অন্তরকে পাপাচার, গুনাহ ও অশ্লীলতা হতে দূরে রেখেছি। অনার্থক ঝগড়-বিবাদ পরিত্যাগ করেছি, যা আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে নির্দেশও করেন: “কেউ যদি ঐ মাসগুলোর মধ্যে হজ্জের সংকল্প করে, তবে সে হজ্জের মধ্যে সহবাস, দুষ্কার্য ও কলহ করতে পারবে না এবং তোমরা যে কোন সৎকর্ম কর না কেন, আল্লাহ তা পরিজ্ঞাত আছেন; আর তোমরা (নিজেদের) পাথেয় সঞ্চয় করে নাও; বস্তুতঃ নিশ্চিত উৎকৃষ্টতম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহভীতি এবং হে জ্ঞানবানগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর।” [সূরাঃ বাকারা: ১৯৭]

দশমঃ হজ পরবর্তীতে আমরা অহংকার-বড়ত্ব প্রকাশ ও রিয়া অর্থাৎ লোকদেরকে স্বীয় আমলের প্রদর্শন জানিয়ে শুনিয়ে দেখিয়ে নিজে তৃপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকব। কেননা এমন মানসিকতা সৎআমল নষ্ট করে দেয়।

একাদশঃ নিজেকে হজের মাধ্যমে সম্মানিত জাহের করা; তা হাজী, আলহাজ ইত্যাদি টাইটেল গ্রহণ ও প্রচার করে বা এ টাইটেলকে পুঁজি করে দুনিয়াবী স্বার্থ অর্জন। এ নীতি আমলটিকে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। হজ পরবর্তীতে দুনিয়াবী লোভ-লালসার প্রাধান্য ও পূর্ণ দুনিয়াদার হওয়া যেমন দোষণীয়, অনুরূপ হালাল রীতি অনুযায়ী ও উপযোগী পর্যায়ে দুনিয়াবী ব্যস্ততাকে বর্জন করে সংসার ত্যাগীও হওয়া ঠিক হবে না।

দ্বাদশঃ হজের সফরে আমরা বহু শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেছি। তার মধ্যে অন্যতম হল আল্লাহর জন্য নিজেকে সোপর্দ করে দেয়া। এর মধ্যে রয়েছে পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম), তার ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ও তার মাতা হাজেরার অনুসরণ।
অতএব এ শিক্ষা হতে আমাদেরকে উক্ত ত্যাগ-তিতীক্ষা ও শিক্ষা নিতে হবে।

হজ কবুলের আলামত

হজ কবুল হলো কি হলো না, তা জানেন শুধু আল্লাহ তাআলা। তবে হজ কবুলের কিছু বাহ্যিক আলামত বা নিদর্শন রয়েছে। যেমন: যাঁরা হজের পরে কাজকর্মে, আমলে-আখলাকে, চিন্তাচেতনায় পরিশুদ্ধি অর্জন করবেন বা আগের চেয়ে উন্নতি লাভ করবেন, তাঁরাই হবেন প্রকৃত হাজি। কিন্তু যাঁরা হজ করার পরও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন বা উন্নতি সাধনে ব্যর্থতার পরিচয় দেবেন, তাঁরা হলেন হজে মারদুদ সম্পাদনকারী। হজ করা বড় কথা নয়; জীবনব্যাপী হজ ধারণ করাই আসল সার্থকতা।

নবী করিম (সা.) বলেন, হজ ও ওমরাহর জন্য গমনকারী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহমান। তিনি দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। কবুল হজের মাধ্যমে মানুষ নিষ্পাপ হয়ে যায়। (মুসলিম, তিরমিজি, মিশকাত)। যাঁর হজ কবুল হবে, হজের পরও ৪০ দিন পর্যন্ত তাঁর দোয়া কবুল হবে; এমনকি যত দিন তিনি গুনাহে লিপ্ত না হবেন, তত দিন তাঁর সব দোয়া কবুল হতেই থাকবে।