পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী(দঃ) করা ইবাদত? | Eid A Miladunnabi


Eid-e-Miladunnobiঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ)তার স্বপক্ষে দলিল : ১৷ সুরা আলে ইমরানের ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ﺍﺫﻛﺮﻭﺍ ﻧﻌﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻜﻢ ” অর্থাৎ তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; ২৷ আল্লাহ পাক সুরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতে এরশাদ করেন, ” ﻗﻝ ﺑﻔﻀﻞ ﺍﻟﻠﻪ ﻭ ﺑﺮﺣﻤﺘﻪ ﻓﺒﺬﺍﻟﻚ ﻓﻠﻴﻔﺮﺣﻮﺍ ﻫﻮ ﺧﻴﺮﻣﻤﺎ ﻳﺠﻤﻌﻮﻥ অর্থাৎ(হে নবী) আপনি বলে দিন‘এ হল তাঁরই অনুগ্রহ ও করুণায়; সুতরাং এ নিয়েই তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত এটা তারা যা (পার্থিব সম্পদ) সঞ্চয় করছে তা হতে অধিক উত্তম। ” ﻋَﻦْ ﺍَﺑِﻰ ﻗَﺘَﺪَﺓَ ﺍﻻَﻧْﺼﺎَﺭِﻯ ﺭَﺿِﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋَﻨﻪُ ﺍَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺳﺌﻞ ﻋَﻦْ ﺻَﻮْﻡِ ﻳَﻮْﻡ ﺍﻻِﺛْﻨَﻴْﻦِ ﻗَﺍﻞَ ﺫَﺍﻙَ ﻳَﻮْﻡٌ ﻭُﻟِﺪْﺕُ ﻓِﻴْﻪِ ﺑُﻌِﺜْﺖُ ﺍَﻭْﺍُﻧْﺰِﻝَ ﻋَﻠَﻰَّ ﻓِﻴْﻪِ – অর্থাৎ হজরত আবু কাতাদা ( রা ) থেকে বর্নিত, নবীজি সাঃ কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন , এই দিনে আমার জন্ম হয়েছে , এই দিনে আমি প্রেরিত হয়েছি এবং পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ এই দিনেই আমার উপর নাজিল হয়েছে ৷

হাদিস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে ” ﻋَﻦْ ﺍِﺑْﻦِ ﻋَﺒَّﺎﺱٍ ﺭَﺿِﻰَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﻰ ﻋَﻨْﻬُﻤَﺎ ﺍَﻧَّﻪٗﻛَﺎﻥَ ﻳُﺤَﺪِّﺙُ ﺫَﺍﺕَ ﻳَﻮْﻡٍ ﻓِﻰْ ﺑَﻴْﺘِﻪٖ ﻭَﻗَﺎﺋِﻊَﻭِﻻﺩَﺗِﻪٖ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻟِﻘَﻮْﻡٍ ، ﻓَﻴَﺴْﺘَﺒْﺸِﺮُﻭَﻥْ ﻭَﻳُﺤَﻤِّﺪُﻭْﻥَ ﺍﻟﻠﻪَ ﻭَﻳُﺼَﻠُّﻮْﻥَﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻓَﺎِﺫَﺍ ﺟَﺎﺀَﺍﻟﻨَّﺒِﻰُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻗَﺎﻝَ ﺣَﻠَّﺖْﻟَﻜُﻢْ ﺷَﻔَﺎﻋَﺘِﻰْ অর্থাৎ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রা ) নিজেই বর্ণনা করেন , একদা তিনি উনার গৃহে সাহাবাদের নিয়ে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের ইতিহাস আলোচনা করতেছিলেন৷ সাহাবাগন শুনে আনন্দিত হয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছেন, নবীজির উপর দরুদ পাঠ করছেন৷ অতপর যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন, বললেন , তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত হালাল হয়ে গেছে ৷

মতপার্থক্যঃ

যে সকল কর্ম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে, সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের যুগে ধর্মীয় কর্ম, আচার বা উৎসব হিসাবে প্রচলিত, পরিচিত বা আচরিত ছিল না, পরবর্তী যুগে মুসলিম সমাজে ধর্মীয় কর্ম হিসাবে প্রচলিত হয়েছে সে সকল কর্মের বিষয়ে সর্বদায় মুসলিম উম্মাহর আলেম ও পণ্ডিতগণ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েন। অনেক আলেম ধর্মীয় কর্ম ও ধার্মিকতার ক্ষেত্রে প্রথম যুগের মুসলমানদেরকে চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ আদর্শ মনে করেন। তাঁরা ইসলামী সমাজের ধর্মকর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানাদি অবিকল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ও তাঁর সাহাবীদের যুগের মত রাখতে চান।

যে কর্ম প্রথম যুগের ধার্মিক মানুষেরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য করেন নি, এদের মতে  সেকাজ কখনো পরবর্তী যুগের মুসলিমদের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হতে পারে না। অপর দিকে অন্যশ্রেণীর আলেমগণ কেবলমাত্র প্রথম যুগে ছিল না বলেই কোন কর্ম বা অনুষ্ঠানকে নিষিদ্ধ বলে মনে করেন না। বরং নতুন প্রচলন বা প্রচলিত কর্ম বা অনুষ্ঠানের পক্ষে যুক্তি প্রমানাদি সন্ধান করেন এবং সম্ভব হলে সমাজের প্রচলনকে মেনে নেন।

যেহেতু মিশরের শাসকগণ ও পরবর্তীকালে হযরত আবু সাঈদ কূকবুরী প্রবর্তিত ঈদে মীলাদুন্নবী জাতীয় কোন অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে, সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের যুগে প্রচলিত বা পরিচিত ছিল না তাই স্বভাবত:ই এ বিষয়েও আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কোন কোন আলেম ৭ম শতাব্দী থেকেই ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের বিরোধিতা করেছেন এই যুক্তিতে যে, সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ তাঁদের প্রচণ্ডতম নবীপ্রেম সত্ত্বেও কখনো তাঁদের আনন্দ এভাবে উৎসব বা উদযাপনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন নি, কাজেই পরবর্তী যুগের মুসলমানদের জন্যও তা শরীয়ত সঙ্গত হবে না।

বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয় জানতে ভিজিট করুন www.prosno.xyz | সাথেই থাকুন www.IslamBangla.Com ভিজিট করতে থাকুন ।

পরবর্তী যুগের মুসলমানদের উচিৎ প্রথম যুগের মুসলমানদের ন্যায় সার্বক্ষণিক সুন্নাত পালন, সীরাত আলোচনা, দরুদ সালাম ও হার্দিক ভালবাসার মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধার অঘ্য জানান, অমুসলিমদের অনুকরণে জন্মদিন পালনের মাধ্যমে নয়। তাঁদের যুক্তি হলো এ সকল অনুষ্ঠানের প্রসার সাহাবীদের ভালবাসা, ভক্তি ও আনন্দ প্রকাশের পদ্ধতিকে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা সৃষ্টি করবে, কারণ যারা এ সকল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভালবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করবেন, তাঁদের মনে হতে থাকবে যে সাহাবীদের মত নীরব, অনানুষ্ঠানিক, সার্বক্ষণিক ভালবাসা ও ভক্তি প্রকাশ পদ্ধতির চেয়ে তাদের পদ্ধতিটাই উত্তম।

এ সকল নিষেধকারীদের মধ্যে রয়েছেন সপ্তম-অষ্টম হিজরী শতাব্দীর অন্যতম আলেম ইমাম আল্লামা তাজুদ্দীন উমর বিন আলী  আল-ফাকেহানী (মৃত্যু: ৭৩৪ হিজরী/ ১৩৩৪খ্রী:), আল্লামা আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ বিন মুহম্মদ ইবনুল হাজ্জ (৭৩৭হি:/১৩৩৬খ্রী:), ৮ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত আলেম আবু ইসহাক ইব্রাহীম বিন মূসা বিন মুহাম্মাদ আশ-শাতিবী (মৃত্যু ৭৯০ হি:) ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম।

অপর দিকে  অনেক আলেম প্রতি বৎসর রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জন্মদিনের ঈদ পালনকে জায়েয বলেছেন, এই যুক্তিতে যে, এই উপলক্ষে যে সকল কর্ম করা হয় তা যদি শরীয়ত সঙ্গত ও ভাল কাজ হয় তাহলে তা নিষিদ্ধ হতে পারে না। কাজেই কুরআন তিলাওয়া, ওয়াজ নসিহত, দান-খয়রাত, খানাপিনা, উপহার উপঢৌাকন বিতরণ ও  নির্দোষ আনন্দের মাধ্যমে বাৎসরিক ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন করলে তা এদের মতে নাজায়েয বা শরীয়ত বিরোধী হবে না। বরং এসকল কাজ কেউ করলে তিনি তাঁর নিয়েত, ভক্তি ও ভালবাসা অনুসারে সাওয়াব পাবেন।

এ সকল আলেমদের মধ্যে রয়েছেন: সপ্তম হিজরী শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা আব্দুর রহমান বিন ইসমাঈল আল-মাকদিসী আল-দিমাশকী হাফিজ আবু শামা (৬৬৫হি:), ৯ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২হি:), আবুল খাইর মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মাদ, শামসুদ্দীন সাখাবী (৯০২হি:/১৪৯৭খ্রী:), নবম ও দশম হিজরী শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম আল্লামা জালালুদ্দীন বিন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী (মৃ: ৯১১হি:) ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম।