কুরআন আমরা কিভাবে পড়বো ও বুঝবো

Quran

পবিত্র কুরআন, দ্বীন ইসলামে এবং ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, পৃথিবীর আর কোন একটি ধর্মের বেলায়, সেই ধর্মের ধর্মগ্রন্থকে এ ধরনের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। মুসলিম জীবনে কুর’আনের ভূমিকা কি তা অনুভব করার ব্যাপারটাও হয়তো বা সবার জন্য উন্মুক্ত নয় – অনেকে যেমন মনে করেন যে, কুর’আনের পথনির্দেশনা এবং নিরঙ্কুশ জ্ঞানের ভান্ডারও সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, কেবল বিশ্বস্ত বিশ্বাসী বা সম্ভাব্য হেদায়েত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন সৌভাগ্যবানদের জন্যই তা উন্মুক্ত হয়ে থাকে। তেমনি এই ব্যাপারটাও – অর্থাৎ, কুর’আনের ভূমিকার গুরুত্ব বোঝার ব্যাপারটাও – সম্ভবত কেবল নির্বাচিত ও বিশিষ্টদের জন্য নির্ধারিত।

রাসূল(সা.)-এঁর ভবিষ্যদ্বাণীকে ইতোমধ্যেই বাস্তবতা দান করে মুসলিম উম্মাহ্ যে আজ ৭৩ ভাগে বা তারও চেয়ে বেশী ভাগে বিভক্ত, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়। অন্য অনেক কিছুর মতই – কুর’আনকে নিয়ে আমরা কি করবো – এই ব্যাপারটা নিয়েই মুসলিম উম্মাহ্ আজ শতধাবিভক্ত। ইসলামের কেন্দ্রীয় ব্যাপার – বলতে গেলে মেরুদন্ড স্বরূপ – এই কুর’আনকে নিয়ে আমাদের অজ্ঞতা ও বিভক্তি কুফফারকে সাহস ও শক্তি যোগায়। তারা বুঝতে পারে যে, আমাদের নিয়ে তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই। কুর’আনকে নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য, বিভ্রান্তি ও বিভক্তির রকমফের একাধারে করুণ ও হাস্যকর। অপাঠ্য ছোট্ট অক্ষরে ছাপা কুর’আনকে একদিকে যেমন কেবল মাদুলির মত গলায় ঝুলিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়, তেমনি, কারুকাজপূর্ণ এমন বিশাল কুর’আনও রয়েছে যার শিল্পকর্ম সম্পন্ন করতে হয়তো কোন শিল্পীর গোটা জীবনটাই কেটে গেছে; আবার এমন অনেক কুর’আনিক ক্যালিগ্রাফি আছে যার পাঠোদ্ধার করা আমার মত সাধারণ মুসলিমের জন্য দুরূহ।

“কুর’আন সবার জন্য নয় বরং গণমানুষ অর্থসহ কুর’আন পড়তে গেলে বিপথগামী হয়ে যাবে” – এমন কথা যেমন উপমহাদেশে দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগকারী গোষ্ঠী বিশেষ প্রচার করে থাকেন। আবার, “যে কেউ একখানা কুর’আন হাতে নিয়ে অর্থসমেত পড়তে শুরু করলেই, সব সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবেন” – এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে – যার মর্মার্থ অনেকটা এরকম যে, একখানা Gray’s Anatomy হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেই, যে কেউ নিজের চিকিৎসা নিজেই করতে পারবেন। কত স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষকে দেখা যায় একটি বর্ণের অর্থ না বুঝেও জীবনের প্রতিটি দিন সকাল বিকাল কুর’আন তেলাওয়াতের (প্রচলিত অর্থে) আমল করে কবরে চলে যান – আবার, কত অভাগা মানুষকে দেখা যায় কুর’আনের ভাষা জানা ও বোঝা সত্ত্বেও তাদের জীবনে কুর’আনের কোন ছাপ নেই। আরো বেশি অভাগা আরেকটা শ্রেণীকে দেখা যায়, পশ্চিম থেকে ধার করা scientific reduction-ism-এর আলোকে কুর’আনকে ব্যাখ্যা করতে চেয়ে, পথভ্রষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত “কাফির হয়ে যাবার” পরিণতি বরণ করতে (যেমনটা ঘটেছিল ড. রাশাদ খলিফার বেলায়, যিনি ১৯ সংখ্যা ভিত্তিক ফর্মূলায় পবিত্র কুর’আনকে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন)।

এটা তো সত্যি যে, কুর’আনের কাছে যাবার সঠিক ও শুদ্ধ পন্থা কি তা না বুঝলেও এবং না জানলেও, আমরা যে কুর’আন থেকে উপকৃত হতে পারছি না – কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন সকল মুসলিমই একথা জানেন। কুর’আন তার অনুসারীদের যে সাফল্য, যে সম্মান, যে আসন, যে শান্তি ও যে অর্জনের অঙ্গীকার করে – বিশ্বব্যাপী কুফফারের লাথি খেয়ে, তাদের পা থেকে পায়ে ঘুরে বেড়ানো মুসলিম জনসমষ্টিসমূহকে দেখে কোথাও তার কোন চিহ্ন খুজে পাওয়া দুষ্কর। বরং, স্বাভাবিক ভাবেই যে কারো মনে হতে পারে যে, কোথাও মারাত্মক কোন গোলমাল বা সমস্যা রয়েছে – এবং নিম্ন মানের ঈমান সম্পন্ন কারো, গভীর নিরাশা উদ্ভূত কুফরিতে ডুবে যাবার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমরা আল্লাহর কাছে শয়তানের চিরন্তন অবস্থা: আল্লাহর দয়ায় নিরাশ হওয়া থেকে আশ্রয় চাই এবং সেই নৈরাশ্যের আনুষঙ্গিক কুফরি থেকেও আশ্রয় চাই।

Leave a Reply